সাগরতলের ছবি নিয়ে শরীফ সারওয়ার

হাসান বিপুল
on May 21, 2015, updated December 15, 2015


 সাগরতলের ছবি নিয়ে শরীফ সারওয়ার

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন প্রথম ক্যামেরা নিয়ে পানির নিচে নামেন শরীফ সারওয়ার, তখনও এটা ছিল স্রেফ শখ। সেই আগ্রহ ক্রমশ নেশায় রূপ নেবে তা বুঝতে থানিকটা সময় লেগেছিল হয়ত। তবে শখ হোক আর নেশা, প্রথম দিন ডুব দেওয়ার পর থেকে সাগরে গিয়েছেন নিয়মিত।

SHARIF_SARWAR“আমি প্রথমে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আর ডিসকভারির মতো টিভি চ্যানেলে আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি দেখে ভীষণ রকম উদ্বুদ্ধ হই। মনে হয়েছিল আমাদের দেশ লাগোয়া সমুদ্রই-বা কী দোষ করল! ২০০৯ সাল থেকেই আমি পত্রিকার চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করছি। সেটাও সহায়ক বিষয় হিসেবে কাজ করেছে।”— বলেন শরীফ।

যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে কাজ শুরু করলেও, কাজে নেমেই এর চ্যালেঞ্জগুলো টের পান শরীফ সারওয়ার।

“আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফির বিষয়টিই আদতে অনেকগুলো সীমাবদ্ধতা মেনে করতে হয়। পানির নিচে আপনি চাইলেই লেন্স পাল্টাতে পারবেন না। ব্যাটারি পাল্টাতে পারবেন না। এমনকি মেমরি কার্ড পুরো হয়ে গেলে কার্ডও বদলাতে পারবেন না। পানির কতটা গভীরে যেতে পারবেন, সেটি আপনার ইচ্ছের উপর নির্ভর করে না। আপনার আন্ডারওয়াটার ক্যামেরা হাউজিং কতটুকু পানির চাপ সহ্য করতে সক্ষম সে অনুযায়ী আপনাকে হিসেব করতে হবে। এগুলো কেবল প্রাথমিক হিসাব।”

কেবল যন্ত্রপাতি থাকলেই হবে না। দরকার স্কুবা ডাইভিংয়ের প্রশিক্ষণ। সেই প্রশিক্ষণের আগে আবার লাগবে শারীরিক যোগ্যতা।

“কেবল সাঁতার জানলেই পানির নিচের ছবি তোলা যাবে, বিষয়টি এমন নয়”— বলেন তিনি।

প্রথম দফা ছবি তুলে আনার পর আরেক দফা হোঁচট খান শরীফ। পত্রিকার ঝকঝকে পাতায় আর টিভির প্লাজমা পর্দায় যে সাগরতলের চকচকে ছবি দেখা যায় তার সঙ্গে মেলে না বাংলাদেশের দক্ষিণে সমুদ্রের নিচে তোলা ছবির ধরন। “পানি এখানে অতটা স্বচ্ছ নয় হয়ত প্রকৃতিক কারণেই। তবে যতটা স্বচ্ছ হতে পারত, আমাদের অসচেতনতার কারণে সেটিও হয়নি।”

কেবল পানির স্বচ্ছতা নয়, আরও অনেক সীমাবদ্ধতার কথা বললেন শরীফ সারওয়ার। “প্রধান চ্যালেঞ্জ আসলে কয়েকটি। প্রথমত বাংলাদেশে এখনও এমন উৎসাহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নেই, যারা এ ধরনের কাজে অর্থ জোগাবেন। বিদেশে যেখানে স্পন্সর পাওয়া যায় প্রকৃতি রক্ষার কোনো উদ্যোগে, এখানে বিশেষ করে সাগরতলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও পরিবেশ রক্ষায় তেমন কোনো স্পন্সর নেই। পুরো কাজটি করতে হয় নিজের পকেটের টাকা খরচ করে। আর যে কোনো অ্যাসাইনমেন্টের চেয়ে আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফির খরচ যথেষ্টই বেশি।

Octopas


“সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সম্ভবত সাগরতলের জীববৈচিত্র্য বিষয়ে জ্ঞানের অভাব। ক্যামেরা নিয়ে পানির নিচে নামার আগে আপনাকে জানতে হবে ওখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে। কেবল পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, আপনার নিজের নিরাপত্তার জন্যও। কোন প্রাণীটি বিষাক্ত বা কোনটি বর্ণচোরা, সেটি বুঝতে হবে আপনাকে। কেবল নিজেকে রক্ষার জন্যই নয়, নিজের অজান্তেই তাদের কোনো ক্ষতি যেন না হয়, সেটি খেয়াল রাখার জন্যও। আছে এমন আরও হাজার দরকারি তথ্য যেগুলো জানা না থাকলে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই বিপদে পড়তে পারেন আপনি।”

Garbage“পানির নিচের গোটা জগতটাই আমাদের উপরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানকার পরিবেশ, বিজ্ঞান আর নিয়মকানুন থেকে একেবারে আলাদা পানির নিচের পরিবেশ, বিজ্ঞান আর নিয়ম।”

যতই চ্যালেঞ্জিং আর কঠিন হোক আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি, শরীফ চান আরও লোকজন যুক্ত হোক এই ‘নেশা’য়। “কেবল বঙ্গোপসাগরে নয়, দেশের নদনদী, বৃহত্তর সিলেট এলাকার হাওড়সহ গোটা বাংলাদেশের সেখানেই স্বচ্ছ পানি আর জীববৈচিত্র্য মিলবে সেখানেই এর সম্ভাবনা রয়েছে।”

যত বেশি লোকজন এতে যুক্ত হবে, আমাদের পরিবেশের জন্য সেটি তত কল্যাণকর হবে আপনাতেই। কারণ, এতে উপজাত হিসেবে তৈরি হবে পরিবেশ সচেতনতা। আর দেশে আলোকচিত্রের একেবারে অপ্রচলিত একটি শাখায় কাজ করার ফলে বিশাল সম্ভাবনার বিষয়টি তো আছেই।