লুইয়ের সত্তার সন্ধানে আলোকচিত্রী স্কট

on May 21, 2015, updated December 16, 2015


 লুইয়ের সত্তার সন্ধানে আলোকচিত্রী স্কট
স্কট বেনেডিক্ট | ©

স্থাপনা হিসেবে আমাদের জাতীয় সংসদকে বিশ্বের সেরা ১০০টির অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার স্রষ্টা লুই আই কান। আর বিশ্বখ্যাত এই স্থপতির দুনিয়া জুড়ে বিস্তৃত স্থাপত্যের আলোকচিত্র তুলে বেড়াচ্ছেন স্কট বেনেডিক্ট গত ৫ বছর ধরে । যুক্তরাষ্ট্র, ভারত বাংলাদেশের মোট ১৮ টি নির্বাচিত স্থাপনার মধ্যে এরমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কান-এর ১১টি স্থাপনার আলোকচিত্র তুলে বাংলাদেশে এসেছেন তার সেরা সৃষ্টি, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্থপত্য শৈলি ক্যামেরায় রেকর্ড করার জন্য। ২০ মার্চ ঢাকায় এলেও সংসদ ভবনের ভেতরে ঢুকে এখনো কাজ শুরু করতে পারেন নি, অনুমতি না মেলায়। লুই আই কানের স্থাপত্য নিয়ে স্কটের ফটোগ্রাফিক ভ্রমণ এবং বাংলাদেশে আসা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন আরিফুর রহমান। 

প্রশ্ন: লুই আই কানের স্থাপত্য গুলো নিয়ে আপনার আলোকচিত্র বিষয়ক মনস্তাত্বিক যাত্রা কিভাবে শুরু হলো?

শুরুটা আকস্মিক। আমার এক স্থাপত্যবিদ মক্কেল নিউ ইয়র্কের উত্তরে একটি আধুনিক ইহুদী ধর্মীয়গৃহের নকশা করছিলেন যে কারণে এর আগের স্থাপত্যটি ধ্বংস করা প্রয়োজন ছিলো। এখানে বলে রাখা ভালো ভবনটি সম্বন্ধে আমার আগের তেমন একটা ধারনা ছিলো না। এ কারনে আমি ইন্টারনেটে এর ছবি খুঁজতে থাকি। কয়েকটি সরল ছবি ছাড়া আর কিছু খুঁজে পেলাম না। তাই আমি জানতে চাইলাম, ধবংসের আগে এটিকে এক নজর দেখে নেয়া যায় কিনা। 

এরপর আমি কয়েকদিন বিকেলের সময়ে ভবনটির ভেতর ও বাহিরের অংশের ছবি তুলতে শুরু করলাম। আমার কয়েকজন স্থাপত্যবীদ বন্ধুর কাছে ভবনটির কয়েকটি ছবি পাঠালাম, তারা এর সম্বন্ধে কিছু জানেন কিনা এটা জানতে। কানের কয়েকজন ছাত্র, তার ছেলে এবং কয়েকজন স্থাপত্য সমালোচকের কাছে এ ছবি গুলো পৌছালো। তাদের কেউ একজন, এই মুহুর্তে নাম মনে পড়ছে না ফিরতি ইমেইলে বলেছিলো, ‘এর আগে লুই এর কাজের ছবি কেউ এভাবে তুলে নি।’ আমিও জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি বলতে চাও।’ জবাব এলো, তোমার লুই এর ডিজাইন করা আরো কয়েকটি ভবন ঘুরে দেখা উচিত। 

এভাবেই শুরু হলো প্রায় পাঁচ বছরের অনিচ্ছাকৃত শৈল্পিক যাত্রা। 

প্রশ্ন: কানের কতগুলো স্থাপত্য নিয়ে আপনি কাজ করতে চান? 

আমি তার ১৭টির মতো উল্ল্যেখযোগ্য কাজ চিহ্নিত করেছি যেগুলো সেই ইহুদী ধর্মীয় উপাসনালয়ে বসে আমি উপলব্দি করেছিলাম যে এগুলোতে কী এমন বিষয় আছে, তা এ যাত্রায় আমি ঘুরে দেখবো। 

প্রশ্ন: এখন পর্যন্ত আপনার যাত্রা কেমন চলছে, কোন কঠিন সমস্যায় পড়েছিলেন কি?

আমি জানি হয়ত ঢাকা এবং আহমেদাবাদ ভ্রমণ করার পর আমার এই ফটোগ্রাফি যাত্রা শেষ হতে যাচ্ছে। এই ফটোযাত্রা পরিকল্পনার সময় আমি নিশ্চিত ছিলাম যে ঢাকায় প্রবেশ করে ছবি তোলার লক্ষ্য পূরণ করতে পারা সবচেয়ে কঠিন হবে। প্রায় দু মাস চেষ্টার পরে আমি একটি যোগাযোগের মাধ্যম খুঁজে পাই যিনি আমাকে সহযোগিতা করতে পারে কিংবা এমন কোন ব্যাক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারে যে আমার প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারবে যেটির মধ্যে আমার শৈল্পিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি লুই আই কান এ বিস্তৃত ।

প্রথমে ইউপিইএনএন (ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া)র লুই আইকান আর্কাইভের উইলিয়াম হিটেকারের সঙ্গে যোগাযোগ হলো, তিনি ধারাবাহিক ভাবে আগের, যেগুলো আমি ইতোমধ্যে ঘুরে এসেছি সেই ১৫টি ভবনের ম্যানেজার বা স্বত্বাধীকারির সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন।

উইলিয়াম এবং অন্যরা আমাকে প্রভাবশালী ও খ্যাতিমান কয়েকজন স্থাপত্যবীদ এবং কর্মীর (activists) সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন যারা পরে আমার পরিকল্পনার প্রশংসা করেন এবং তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে কাজটি কিভাবে করা যায় তার সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা চালান। 

তাদের সকলের অনেক চেষ্টার পর যখন প্রায় সব আশাই শেষ হয়ে আসছিলো তখন তারা বললেন কাজটি শেষ করার অনুমতি একমাত্র দিতে পারেন এই সংসদের স্পিকার। 

এ কারণে আমি নিজেই দায়িত্ব তুলে নিয়ে আমার লক্ষ্য বর্ণনা করে সরাসরি স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীকে একটি ইমেইল করলাম। আমি ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার জন্য ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকলাম এবং ঢাকায় অবস্থানের সময়সীমাও বাড়ালাম। আমার আশা ছিলো হয়তো ভবনটির ভেতরের ডিজাইন ক্যামেরাবন্দী করার সুযোগ মিলবে।

প্রশ্ন: এই যাত্রায় আপনার কোনো স্মরনীয় মুহুর্তের কথা আমাদের বলতে পারেন?

গত সোমবার সংসদ ভবনের ভেতরে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিলো এবং আমাকে বলতেই হবে যে আমি সেদিন যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তা আমার সমস্ত চিন্তাকে ছাড়িয়ে গেছে। সেই ঘটনাটি ছিলো এমন একটি আবেগঘন মুহুর্ত যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। গেলো বছরগুলোতে এতগুলো স্থাপনা দেখার পরে আমার দৃষ্টিতে মনে হয়েছে এটি একমাত্র স্থাপত্য যা কানের সাফল্যের চূড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রশ্ন: কানের জগতে প্রবেশ করার কোন আশা আছে কি? 

আমি বুঝতে পারছি, আমার স্বল্প জ্ঞানের বাইরেও সংসদ স্পিকারের অনেক রকমের দুশ্চিন্তা রয়েছে তবুও আমি আশায় বুক বেধে আছি হয়তা স্বল্প হলেও একটি সম্ভাবনা রয়ে গেছে যে আমি আমার ক্যামেরা নিয়ে ভেতরে যেতে পারবো যেহতু আমার গল্প বলার ধরনটা আমার ফিল্টারের ভেতরে তাকানো দৃষ্টির উপর নির্ভর করে।

যদি সামনের দিনগুলোতেও এটি সম্ভব না হয় তাহলে আমার অপ্রত্যাশিত তীব্র নিমগ্নতাকে নিয়ে আশা রেখে আমার প্রকল্প নিয়ে চেষ্টা অব্যাহত রাখবো। হয়তো পরের কোন বছরে আবারও ফিরে আসা হবে।

প্রশ্ন: আপনি তো আপনার যাত্রার প্রায় শেষ প্রান্তে, আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি হবে?

কানের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে একটি শিক্ষামুলক বই প্রকাশের ইচ্ছা আছে যেটি নবীনদের কাছে কানের কর্মকাণ্ডের সারমর্ম তুলে ধরবে এবং যারা ইতিমধ্যে তার প্রতিভা ও আবেগ সম্বন্ধে জানেন তারাও কানের কাজ সম্বন্ধে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ খুঁজে পাবেন।

গবেষণার জন্য ইউপিইএনএন এর লুই আইকান আর্কাইভে ডিজিটাল ফাইলগুলো দান করা হবে এবং প্রত্যেকটি ভবনগুলোর রক্ষকদের জন্যও একই অফার থাকবে যাতে এই অসাধারন ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ করা যায়।

"The pictures are there, and you just take them." ~ Robert Capa