দু’চাকায় আলাস্কা থেকে টরন্টো

মুনতাসির মামুন
on May 21, 2015, updated December 15, 2015


 দু’চাকায় আলাস্কা থেকে টরন্টো
জলবায়ু সচেনতা, বিশেষ করে আবর্জনা বিষয়ে সচেতনতার বাণী নিয়ে সম্প্রতি সাইকেল ভ্রমণ সম্পন্ন করেছেন তিন আরোহী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর পশ্চিমে হীমশীতল আলস্কা থেকে শুরু হওয়া এই সফর শেষ হয়েছে কানাডার টরন্টোয়। প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার পেরোনো ওই সাইকেল টুরের

আরও ১০ বছর পর পৃথিবীর অবস্থা কি হবে? জলবায়ুর পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে? যদি সময়ের ব্যপ্তি  আরো বাড়িয়ে ধরা হয়– ধরুন ১০০ বছর? তখনও কি আমাদের দেশের যে ভৌগলিক সীমারেখা, তাই কি থাকবে?

এমন প্রশ্নের কী উত্তর হবে সেটা হয়তো আমাদের অনেকেরই জানা নেই। আর একারণেই সম্ভবত ক্লাইমেট চেইঞ্জ বর্তমান দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত বিষয়গুলোর অন্যতম। ক্লাইমেট চেইঞ্জে আমাদের পরিণতি অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক করুন হবে– এটা আর নতুন করে আবিষ্কারের কিছু নয়। তবে আমরা, আম জনতা হিসেবে এর প্রতিকার কীভাবে করতে পারি তার জন্যই আমরা তিন বন্ধু সাইকেলে এক প্রচারণা-অভিযান করার পরিকল্পনা করি অনেক আগে।

পরিসংখানে দেখা যায়, পৃথিবীতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর কলকারখানা থেকে শুরু করে তাদের নিত্যনৈমতিক জীবনযাপনে কার্বন নিঃসরণ হয় সবচেয়ে বেশি। পরিবহন, গৃহস্থালী থেকে শুরু করে খাদ্যাভ্যাস, সব কিছুইতে প্লাস্টিকজাতীয় পণ্যের বিপুল ব্যবহার এই কার্বন নিঃসরণকে বাড়িয়ে দেয়।

আর প্লাস্টিকের তৈরি যেকোনো পণ্য তৈরিতে যেমন কার্বনের নিঃসরণ হয় তেমনি আর্বজনা হিসেবেও এটা পরিবেশের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর। তাই বিশ্বব্যপী প্লাস্টিকের এই অধিক ব্যবহারের ফলে জলবায়ুর যে পরিবর্তন আসছে তাতে আমাদের মত দেশগুলোর জন্য ভয়াবহ।

মানুষ যাতে প্লাস্টিকে তৈরি পণ্যের ব্যবহার কম করে তার জন্য আমাদের এই অভিযান।

অভিযানের শুরু আলাস্কায়

অভিযানের শুরু আলাস্কায়। মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের এই রাজ্যটি আকারে বিশাল আর জনসংখ্যা খুবই কম। বেশিরভাগ মানুষ থাকে রাজাধানী অ্যাঙ্করেজে। তাই শহরের বাইরের যে দোকানপাট কম থাকবে তার জন্যই মনে হয় আমরা সদাইপাতি একটু বেশিই করে ফেল্লাম। তার জন্য ১৬ জুন সকালে যখন আমরা সাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামলাম, আমার ট্যান্ডেম (দুইজন মিলে চালাতে হয় এমন সাইকেল) এর পিছটা এতটাই ভারি হয়ে গিয়েছিল যে আমি কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলাম না। বার কয়েক এদিক ওদিক করে শেষটায় আর সমস্যা হলো না।

আলাস্কার সৌন্দর্যের গল্প আগে পড়া হয়েছিল কিংবা টিভিতে যা দেখা, বাস্তব আসলেও আরও বেশি অন্য রকম। এখানে নীল সাগরের মত আকাশে দূর পাহাড়ের চুড়া ঢেকে থাকা তুষার নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সবুজ গাছের ঝাড় আর ঠিক রাস্তার সোল্ডারের মিটার খানেক দূরে বুনো ফুলের সৌর্ন্দয্য আলাস্কার অতি পরিচিত রূপ। এই রূপের সঙ্গে বন্য প্রাণির গল্প আমাদের আগে থেকেই শোনা ছিল। গ্রিজলি বেয়ার দেখলে কি করতে হবে, ব্ল্যাক বেয়ার দেখলে কি করতে হবে তা আমাদরে শোনা হয়েছিল বেশ। তবে তখনও ঠিক বিশ্বাস করতে পারা যায়নি যে আসলেও আমরা বেয়ার দেখতে পাব।

তার মধ্যে জীবনে প্রথমবার মিড নাইট সানের সৌন্দর্যটা আসলেও অসাধারণ। প্রথমটা কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিল। সারা দিন, সারারাতই আকাশে আলো থাকে, তাই আমাদের সকাল হতে শুরু করলো বেশ দেরি করেই। কিন্তু এটা বুঝতে আমাদের সময় লাগলনা যে, বেলা পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদের আলো থাকলেও তেজ আর থাকেনা বল্লেই হয়। তাই দুই দিনের মাথায় লম্বা দিনের যে সমীকরণ আমরা করে ছিলাম সেটা বদলে গেল। জুন মাসের করুণ সামারের জ্বলজ্বলে বিকাল আমাদের হাড় কাঁপিয়ে দিতে দ্বিধা করতো না।

এটাই নাকি সামার! তা হলে শীত কেমন হবে? ভীষণ ঠাণ্ডার বর্ণনা আগেই পড়েছিলাম কিন্তু আঁচ করতে পারিনি, যা এখন সহজেই অনুমেয়।

আলাস্কায় পাহাড় আছে। উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ মাউন্ট ম্যাককিলি এখানকার ডানালি পার্কেই অবস্থিত। বিশাল গ্লেসিয়ারগুলোকে রাস্তা থেকেই দেখতে পাওয়া যায়, যা আলাস্কার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়ে বহুগুণে। আর গ্লেসিয়ার থেকে নেমে আসা লেকগুলোর পানি যেন নীল কালি গোলা। অপার নৈসর্গিক দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে সাইকেল চলে যায় পিচঢালা পথে। উত্তরের পর্বতের আধিক্য আর দূরত্ববেড়ে যাবার কারণেই আমরা ডানালির পথ ধরিনি। দক্ষিণের পথ ধরে এগিয়েছিলাম কানাডার দিকে। এই পথই সব থেকে ছোট কানাডার বিভার ক্রিক কস্টমস পর্যন্ত।

কানাডার পথে

ঘড়ির সময় ধরে আমরা রাতের হিসাব মিলিয়ে নিতাম কেননা রাত যে কখন হতো তা আমরা বুঝতেই পারতাম না। ক্যাম্প গ্রাউন্ডগুলোও বেশ দারুন। আহামরি না হলেও পাহাড়ের কোণে কিংবা পাদদেশে বা কোনো লেকের পাড়ে এমন ক্যাম্প গ্রাউন্ডগুলোতে আমাদের রাতের বেলায় থাকা হতো। খরচার মধ্যে তাবু ফেলার জন্য একটা নির্দিষ্ট টাকা। তবে কিছু কিছু জায়গায় গোসল করার জন্য বাড়তি পয়সা গুনতে হতো। রান্না আমরা নিজেরাই করতাম। সারাহ নিরামিষাশী হওয়ার কারণে আমাদের রান্না হতো দুই পদের। আমি আর কনক, পাস্তা আর সারাহ’র জন্য কিনওয়া। রান্না হতো আমাদে ছোট্ট স্টোভে। সেকি আয়োজন করে সেই রান্না করা! সারাবেলায় এই একবারই আমরা মনের মত করে খেতাম। খাওয়া শেষে তাবুতে।

১২ দিন পরে আমরা বিভার ক্রিক দিয়ে কানাডায় ঢুকলাম। আলাস্কা থেকে বের হয়ে যাবার আগে যেখানে ছিলাম, জায়গাটা আসলেও অসাধারণ। একটা গ্যাস স্টেশান, রেস্টুরেন্ট, মোটেল আর মুদি দোকান। তাই আল্লাদে আটখানা আমরা। প্রথমটায় ভাবলাম আলাস্কার শেষ দিনটা আর ক্যাম্প না করি তাই মোটেলের খোঁজ নেয়া হলো। ওহ! বেজায় খরচ। মোটেল মালিকও মনে হয় বুঝে গেলেন আমাদের অবস্থা। তাই হেসে বললেন – ঐ সামনের জায়গাটাও আমাদের। ওখানে ক্যাম্প করা যায় বিনা পয়সায় আর আমরা যেহেতু সাইকেল চালাচ্ছি তাই আমাদের জন্য খাবার আর ব্যবহারের পানি তার দোকান থেকেই নিতে পারবো। শুধু গোসলের জন্য পয়সা দিতে হবে। আমাদের আপত্তির আর কিছু ছিলনা।

ছোট্ট একটা কাঠের ব্রিজ পার হয়ে মাঠের মধ্যে চলে আসি। পাশেই দারুন সুন্দর সরু একটা নদী। তার স্রোতের সুরধারায় আমরা ক্যাম্পে করে ফেলাম। যদিও মনে হচ্ছিল এই নদীর পানিতে ঝাপিয়ে পরতে পারলে মনে হয় জীবন স্বার্থক হয়ে যাবে। কিন্তু এত ঠাণ্ডা পানি আমাদের সহ্য হবে না। তাই সে আশা বাদই দিলাম। তবে চারপাশের ঘাসে ঘেরা বিস্তর সমতলে আমাদের তাবুই যেন একটা দ্বীপ হয়ে গেল। আর পরন্ত বিকালের সোনালী আভায় রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিলাম।

লার্জার দ্যন লাইফ : ইউকন

আলাস্কা থেকে আমেরিকার বর্ডার পার হয়ে আমরা কানাডার ইউকনে ঢুকে গেলাম। এখান থেকে কানাডার কাস্টম আরও ২০ মাইল। এই পুরোটা পথ মনে হয় নোম্যন্স ল্যান্ড। আর পথের মশ্রিন ভাবটা এবারেই নেই আর। পিচঢালা পথ তবে অনেক পুরোনো তাই মনে হয় উপরের স্তরের ছোট নুড়িগুলো ঝরঝরে হয়ে গেছে, যার জন্য জোরে সাইকেল চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে যদিও বা শরীরের কষ্টটা হচ্ছে একই।

এই কুড়ি মাইলে থামাও হলো বেশ। পরিবেশটাই কেমন যেন থম থমে। ভাল্লুকের ভয়ও বেড়ে গেল বহুমাত্রায় । দূরে কালো কিছু দেখলেই মনে হয় ভাল্লুক নাতো? এমনভাবে কতবার যে থামা হলো, গাড়ির জন্য অপেক্ষা করা হলো, শুধু এটাই জিজ্ঞেস করা– আচ্ছা সামনের কালো জিনিসটা কি ভাল্লুক? অনেকেই হেসে ঠাট্টা করেছেন আবার অনেকে আমাদে অসহায়ত্ব বুঝতে পেরেছেন। দুই সাইকেলের গতি দুই রকম হবার কারণে ব্যপারটা আরও জটিল আকার হয়ে গিয়েছিল। কখনও কনক ভাই একাই সামনে আবার কখনও তিনি অনেক পিছনে। পাহাড়ী পথের কারণে কেউ যদি একটু পিছিয়ে পরে তো তাকে আর দেখা যায় না। বেশ কিছুক্ষণের জন্য । আর সে সময়টাতে দুই দলের মানুষের মধ্যেই চলে দারুন শঙ্কা।

বিভার ক্রিকের কাস্টমসে কোনো ঝামেলাই হল না। যদিও আমাদের পাসপোর্ট নিয়ে অনেকের অনেক ধরনের অভিঞ্জতা আছে, আমরাও এমনটা ভাবছিলাম। কিন্তু কিছুই হলো না। বিনা বাক্যে ঢুকে গেলাম ‘লার্জার দ্যন লাইফ’-খ্যাত ইউকন প্রভিন্স এ।

বিভার ক্রিক একটা ছোট্ট শহরের নাম। প্রথমে যে গ্যাস স্টেশনটা তার সঙ্গেই একটা ক্যাম্প গ্রাউন্ড আছে। আমরা ওটাতেই হানা দিলাম। বেলা এখনও মেলা বাকি। কিন্তু আজ আর চালাবো না বললে সবাই সম্মতি দিল।

পাইন গাছের ফাঁকে আমাদের ক্যাম্প করার জায়গা। আশপাশে কিছুটা দূরে একটা আরভিও আছে। তবে অন্য কোনো ক্যাম্পার দেখতে পেলাম না। কাজেই আমরা আমরাই। সময় থাকায় প্যনিয়ার থেকে জিনিসপত্র বের করে রোদে দেওয়া হল। আর যেহেতু সময় আছে তাই ভাল কিছু রান্না করার জন্য সবাই বসে গেলাম।
শহরটা আসলেও অনেক ছোট। হাঁটতে বের হয়ে সেটা আরও বোঝাগেল। এখানে কোনো এক সময় মনে হয় সোনার খনি ছিল, স্থানীয় ভাবে বলা হয় গোল্ডরাশ।

বিকালের দিকে ফিরে এলাম। কনক ভাইয়ের শরীরটা একটু খারাপ। বেশি খারাপ লাগলে আগামী কালও না চালানর কথাই ভাবলাম আমরা। শুয়ে বসে আর সাইকেল মেরামত করে বাকি দিনটা পার করে দেয়া হলো। আসলে প্রতিদিনের চালনোর পর যে সময়টা পাওয়া যায় তা উপভোগের একমাত্র পন্থা হলো আড্ডা দেওয়া। আর এর মধ্যেই চলে পরের দিন কোথায় থাকা হবে, রাস্তার পরিস্থিতি কি, দোকান পাওয়া যাবে কিনা? সারাহ তথ্য জোগারে ওস্তাদ। আমাদের ব্লগের সব লেখাই তার।

ইউকন কানাডার সর্ব পশ্চিমের প্রভিন্সের নাম আর হোয়াইটহর্স হলো এর রাজধানী। আর আমরা যাবও এই হোয়াইটহর্সেই। ইউকন যেন আরও বেশিই ফাঁকা। মাঝে মাঝে গাড়িগুলোই আমাদের সঙ্গী। এ ছাড়া চারদিক শুনশান। বেশ ভয়ই লাগে কেননা ইউকনে ভাল্লুকের বিচরণ অনেক বেশি। আর তাই আমরা চেষ্টা করছিলাম একসঙ্গে চালানর। এর মধ্যে আমাদের মতই সাইকেল নিয়ে নিছক আনন্দ লাভের জন্য এই পথেই পাড়ি দিচ্ছে সুইজারল্যান্ডের মার্টিন আর সিমন। সমবয়সী দুই জনকে দারুন লাগল। আর যেহেতু একই দিকে যাওয়া হচ্ছে তো অলিখিত একটা টিম হয়ে গেলাম আমরা।

এই পথে মনে হয় টিমে থাকাটাই ভাল। কেননা ক্যাম্প গ্রাউন্ডগুলোতেও ভাল্লুকের সর্তকবাণী। রান্না করার জন্য চলে যেতে হয় খানিকটা দূরে যাতে রান্নার গন্ধ তাবুতে না যায়। নিয়ম হলো একটা ত্রিকোণ তৈরি করা। এক জায়গায় রান্না, এক জায়গায় খাওয়া আর এক জায়গায় তাবু। ভাল্লুক প্রবল ঘ্রানশক্তিসম্পন্ন প্রাণি। তাই এর হাত থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ পথ হলো, তাকে আকৃষ্ট করে এমন কোনো কিছু যাতে রাতের বেলা তাবুর আশপাশে না থাকে। মাঝে মাঝে অবস্থা বেগতিক দেখে খাবারের জিনিসপত্রগুলোকে তাবু থেকে দূরে রেখে আসা হতো। কেউ কেউ রশি দিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়েও রাখত।

পথে ভাল্লুকের দেখাও হয়েগেল আমাদের। তাও গ্রিজলি। দেখতে বাদামী রংয়ের এই বিশাল প্রাণিটিই সবার যেমন আর্কষণের কেন্দ্রবিন্দু । ঠিক তেমনি মানুষ ভয়ও পায় একে। আমরা প্রতিদিনের মতো আগুপিছু করে সাইকেল চালাচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই সামনে খেয়াল করে দেখলাম একটা গাড়ি রাস্তার ডান পাশে থেমে আছে আর সামনের সিটে যিনি বসে আছেন উনি তার মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছেন। কিছুটা কাছাকাছি আসতেই শুনতে পারলাম সামনেই গ্রিজলি। তাই সবার আগে আমিই সাইকেলটা থামিয়ে দিলাম। একে একে নেমে গেলাম সবাই। সাইকেলটাকে ঘুরিয়ে আবার খানিকটা পিছিয়ে নিয়ে এলাম। উত্তেজনা সবার মুখে। তবে আমি মনে হয় সব থেকে ভীত। তাই আর আগবাড়াবার সাহস করলাম না। সাইকেল নিয়েই দাঁড়িয়ে গেলাম। আর সবাই প্রায় মিটার কুড়ি দূরের রাস্তা থেকে ডান দিকে সবুজে ঘেড়া ছোট্ট জায়গাটার কাছাকাছি গেল। তবে কেউ রাস্তা থেকে সরল না। এর মাঝে আরও কয়টা গাড়ীও থেমে গেছে। হু, মাত্র ১০ মিটার দূরেই ভাল্লুক নিশ্চিন্ত মনে মধ্যাহ্ন ভোজনে ব্যস্ত।

মার্টিন, সিমন, সারাহ আর কনক ভাইকে দেখলাম দূর থেকে ছবি তুলছেন। খানিক বাদে তারা ফিরে এলে তাদের উচ্ছসিত মুখগুলো দেখতে ভাল লাগল। সাইকেলে উঠে গেলাম। যাবার সময় একঝলকের জন্য ডানে তাকালাম বিশালাকার ভাল্লুকটা তখনও ঘাস খেয়েই যাচ্ছে। প্রাণপনে চালিয়ে যতটা দূরে যাওয়া যায় চলে গেলাম। এবার থামার পালা। ছবি দেখতে হবে। সারাহ দারুন ছবি তুলেছে।

সেদিন আরও ঘন্টা তিনেক সাইকেল চালাম। ক্যাম্প গ্রাউন্ডে আবার গ্রিজলির গল্প সঙ্গে রান্নার যোগার । সে রাতে আড্ডা হল বেশ। তবে একটা ভয় মনের মধ্যে ঢুকে গেছে, হুম – সত্যিই ভাল্লুক আছে! আমাদের সাবধান হতে হবে আরও বেশি।

বেওয়াশ ল্যান্ডিংয়ের কথা ইউকনে ঢোকার আগে থেকেই শুনেছিলাম আমরা। ৬টা গ্রিজলি চলে এসেছিল পথের একদম কাছে। গাড়ি চালকেরা আমাদের দেখে প্রায় প্রতিদিনই আপডেট দিত – কোথায় তারা ভাল্লুক দেখেছেন, কতগুলো দেখেছেন। আমাদের সব থেকে ভয় ছিল এইবেওয়াশ ল্যান্ডিং নিয়ে। এত কথা শোনা হয়েছিল যে মনের মধ্যে সবসময় একটা খচখচ ভাল চলে আসত এর নাম শুনলেই। আজ তাই সবাই আরও বেশি একসঙ্গে, প্রায় কাছাকাছি ভাবে পুরো রাস্তা জুড়েই আমরা। গাড়ি কম থাকার যেমন একটা সুবিধা আছে তেমনি আছে ভয়!

আজ আকাশটা সকাল থেকেই কিছুটা ভাড়ি আর গুমোট। সবার মধ্যেই একটা তটস্থ ভাব। বিকালের আগে পৌছে যেতে হবে ক্যাম্প গ্রাউডে। তাই সারাটা বেলা আমরা সে হিসেবেই চালালাম। কিন্তু হায় যেখানে আমাদের ক্যাম্প করার কথা সেখানে শুনাশান নিরবতা। এমন কেন? আমরা যে গাইড বইটা ফলো করছিলাম সেটাই সবথেকে নতুন আর সেখানেও দেয়া আছে একাটা ক্যাম্প গ্রাউন্ড তো বটেই, আরও একটা মোটেল। কিন্তু কোথায়? কোনো কিছুই আমরা খুঁজে পেলাম না। যেন বেমালুম হাওয়ায় মিশে গেছে সব। এদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। আমরা সারাদিন ভাল্লুকের ভয়ে এই অবধি আসার জন্য মড়িয়া হয়ে ছিলাম আর এখন এখানে আসার পর দেখা গেল কিছুই নাই। কি আশ্চর্য!

মোটেলের কাঠের বিল্ডিংটা দেখা গেল, কিন্তু মানুষ কই? এরই মধ্যে ইঞ্জিনের শব্দ কানে আসতে আমরা প্রাণে বায়ু পেলাম। হ্যালো, হাই ই ই!! গাড়ি থামালো, ইজ দেয়ার এনি ক্যাম্প গ্রান্ড অ্যারাউন্ড দিজ প্লেস? ওহহো, নো। নট এনিমোর! আমাদের মনে যত শক্তি ছিল তাই সম্বল। আজকের মত অসহায় মনে হয় এই ট্রিপে আর হইনি কখনও, আরও ১৫ মাইল যেতে হবে। আর আজই মনে সূর্যও আমাদের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে।

কিইবা করার আছে। মারাত্মক ক্ষুধাও পেয়ে গেছে। যার কাছে যা ছিল তাই খেয়ে রওনা হলাম একাট্টা হয়ে।
আর যতটা দ্রুত চালান যায়। এমন অবস্থায় মনে হয় শরীরও বুঝে যায় বাগড়া দিয়ে লাভ নাই। তাই ঘড়ির কাটা ঘুরে যাবার আগেই আমরা পৌছে গেলাম আরেকটা ক্যাম্প গ্রাউন্ডে। ওহ! যা হোক বাঁচা গেল আজকের মত।