কাবুল থেকে কোলকাতা: সম্পর্ক, স্মৃতি ও পরিচয়

আব্দুল্লাহ জায়েদ
on May 21, 2015, updated December 15, 2015


 কাবুল থেকে কোলকাতা: সম্পর্ক, স্মৃতি ও পরিচয়

আগডুম-বাগডুম খেলা ফেলে ‘কাবুলিওয়ালা, ও কাবুলিওয়ালা’ বলে ছুটে গিয়েছিল মিনি। “ময়লা ঢিলা কাপড় পরা, পাগড়ি মাথায়, ঝুলি ঘাড়ে, হাতে গোটাদুই-চার আঙুরের বাক্স, এক লম্বা কাবুলিওয়ালা”– শুরুতে রবীন্দ্রনাথ সেই কাবুলিওয়ালার বর্নণা দিয়েছিলেন এভাবেই।

আফগানিস্তানের সেই কাবুলিওয়ালারা ভারতবর্ষ জুড়ে ঘুড়ে বেরিয়েছেন কয়েক শতক ধরে। তবে বিশ্বকবির ছোটগল্পটি দিয়েই যেন সাহিত্য আর ইতিহাসের পাতায় একযোগে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল কাবুলিওয়ালা নামটি।

মাঝখানে পার হয়ে গেছে এক শতকেরও বেশি। বিশ্বকবির লেখা থেকে অণুপ্রাণিত হয়ে সময়ের বাঁকে হারিয়ে যেতে বসা রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালাদের খোঁজে নেমেছিলেন দুই আলোকচিত্রী মোসকা নাজিব ও নাজেস আফরোজ। এই জাতিগোষ্ঠীর জীবনের সামাজিক পরিবর্তনগুলো ক্যামেরার দৃষ্টিতে ধারণ করেছেন তিন বছর সময় নিয়ে।

এই দুই আলোকচিত্রীর ছবি নিয়ে গ্যেটে ইনস্টিটিউট আর দৃক গ্যালারি মিলে আয়োজন করেছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘কাবুল থেকে কোলকাতা: সম্পর্ক, স্মৃতি ও পরিচয়’।

২৪ এপ্রিল, শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টায় দৃক গ্যালারিতে উদ্বোধন হবে সবার জন্য উন্মুক্ত প্রদর্শনীর। চলবে ৬ মে পর্যন্ত, বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
 
দুই আলোকচিত্রীর মধ্যে মোসকা নাজিবের জন্ম আফগানিস্তানে। তবে বেড়ে ওঠা ভারতে। মায়ের পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে ফটোগ্রাফিতে নাজিবের হাতেখড়ি ৮০-র দশকের শেষ দিকে। বিবিসি নিউজ ওয়েবসাইটসহ একাধিক প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে তার আলোকচিত্র। বিবিসিতে প্রযোজক এবং সংবাদদাতা হিসেবে কাজের সূত্রে দক্ষিণ এশিয়ার নানা প্রান্তে আলোকচিত্র এবং ফিল্মের মাধ্যমে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। ক্যামেরা হাতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় হলেও এটিই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনী।
 
নিজের মাতৃভূমি থেকে দূরে থাকার সুবাদে সব সময়েই আত্মপরিচয়ের খোঁজে আকৃষ্ট হয়েছেন ভারতে বসবাসরত আফগান বংশোদ্ভূত এই নারী। আর এ ভাবনা থেকেই ভারতে বসবাসরত আফগানিস্তানের পুরাতন এই গোষ্ঠীর এ সময়ের জীবনযাপনকে আলোকচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে আগ্রহী হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন নাজিব।
 
জন্মসূত্রে পাওয়া নিজস্ব পরিচয়কে ধরে রেখে একটি নতুন দেশে, নতুন জায়গায় গিয়ে বসতি গড়ে তোলাটা কতোটা কঠিন, আলোকচিত্রগুলোর মাধ্যমে দর্শক কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

“আমি এই ছবিগুলো তোলার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেছি যে কী করে একটি গোষ্ঠী ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়কে আগলে রেখেছে। তাদেরকে বোঝার মাধ্যমে আমার নিজের দেশ আফগানিস্তানের মানুষের সঙ্গে ওদের একটি যোগসূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি আমি।”– বলেন মোসকা নাজিব।অন্যদিকে ভারতীয় সাংবাদিক নাজেস আফরোজ আলোকচিত্রের সঙ্গে জড়িত তিন দশক ধরে। সাংবাদিকতা করেছেন পত্রিকা ও টেলিভিশন উভয় মাধ্যমেই। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ করেছেন দেড় দশক। বিবিসি, আল-জাজিরা সহ বিভিন্ন প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে তার আলোকচিত্র।

রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালাদের পথ অনুসরণের পেছনে নাজেস আফরোজের কারণটা ছিল খানিকট ভিন্ন। প্রদর্শনীর আলোকচিত্রগুলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, পরিচয়হীনতা এবং একটি নতুন পরিচয় ধারণ করা-এসবকিছু নিয়ে একটি ধারণা পেতে সাহায্য করবে এবং দর্শককে ভাবিয়ে তুলবে বলে আশা করছেন আফরোজ।

পাশাপাশি নিজের শহর কলকাতার প্রতি তার আবেগের স্থানটাও উঠে এসেছে তার আলোকচিত্রে। “একসময় কলকাতা শহরটি ছিল দারুন বৈচিত্র্যেময়। আর এই বিচিত্র শহরই আজকের এই আমাকে ‘আমি’ করে তুলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি যে গত কয়েক দশকে সেই বৈচিত্র্য কোথায় যেন ফিকে হয়ে গিয়েছে। আর এই পরিবর্তন আমার জন্য কোনভাবেই সুখকর নয়। এই আলোকচিত্র সিরিজের মাধ্যমে আমি সেই পুরাতন বৈচিত্র্যময় কলকাতাকে সকলের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বলা যায়, এটি কলকাতার প্রতি আমার শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি মাধ্যম মাত্র!”– কলকাতার প্রতি নিজের আবেগের জায়গাটা এভাবেই ব্যখ্যা করেন আফরোজ।

"When you photograph people in color you photograph their clothes. When you photograph people in black and white, you photograph their soul!" ~ Ted Grant